বিমানবন্দরে আটকে আছে টেস্টিং কিট পিপিই

সিটিজি ভয়েস টিভি ডেস্ক:    

ঢাকা কাস্টম হাউসে কর্মকর্তাদের দায়িত্বে অবহেলা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। সরকারকে সহায়তা করতে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আনা করোনাভাইরাস পরীক্ষার কিট ও পিপিইসহ বিভিন্ন সামগ্রী খালাসে অহেতুক হয়রানি করা হচ্ছে।

এক্ষেত্রে খোদ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নির্দেশনা অমান্য করা হচ্ছে। ফলে জরুরি পণ্যের খালাস দিনের পর দিন আটকে থাকছে। এমনকি অভিযোগ উঠেছে, ঘুষ ছাড়া এখানে কোনো কিছু খালাস করা কঠিন। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

আমদানিকারক ও সিএন্ডএফ এজেন্টদের কয়েকজন যুগান্তরকে বলেন, করোনাভাইরাস প্রতিরোধে বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠান সরকারের পাশে দাঁড়াতে চীন থেকে চার্টার্ড বিমানে করোনাভাইরাস পরীক্ষার কিট, পিপিই ও সেবাসামগ্রী আমদানি করছে। কিন্তু এসব পণ্য খালাসে নানারকম অজুহাত খাড়া করা হচ্ছে। এজন্য ঢাল হিসেবে তারা নিজেরাও করোনা ঝুঁকিতে পড়তে পারেন- এমন আশঙ্কার কথা বলে দায়িত্ব পালন থেকে সরে থাকছেন।

পাশাপাশি আইনগত ফাঁকফোকর তালাশ করতেও তারা ব্যস্ত। এজন্য যেসব কাগজ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে সর্বোচ্চ ৫ মিনিট সময় লাগার কথা, সেখানে তারা ৩-৪ দিন পার করছেন। সোমবারও একটি সার্জিক্যাল গ্লোবসের চালান খালাসেও ঘুষ নেয়া হয়েছে। এছাড়া কেউ কেউ ১৫ দিনেও তাদের পণ্যসামগ্রী ছাড়াতে পারেননি।

তারা বলছেন, অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় বাণিজ্যিক আমদানিকারক এবং শিল্প উদ্যোক্তারা এখন ঢাকা কাস্টমসে সবচেয়ে বেশি অনিয়ম-হয়রানির শিকার হচ্ছেন। বর্তমান কমিশনার পণ্যের শুল্কায়ন কার্যক্রমকে হয়রানিমুক্ত করতে চাইলেও মাঠ পর্যায়ে কর্মরত কর্মকর্তাদের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ নেই বললে চলে। কেননা তিনি যেভাবে নির্দেশনা দিচ্ছেন কার্যত মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা তা মানছেন না।

সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা, রাজস্ব কর্মকর্তা এবং অ্যাসেসমেন্ট গ্র“পের সহকারী ও উপকমিশনাররা ফ্রি স্টাইলে সিএন্ডএফ এজেন্টের কাছে ঘুষ দাবি করছেন। অবশ্য এই ঘুষ তারা নিজের হাতে নেন না। প্রত্যেক অফিসারের অধীনে ‘ফালতু’ নামে বিশেষ আদায়কারী আছে। যারা বহিরাগত দালাল। তারাই কর্মকর্তাদের পক্ষে ঘুষের রেট ঠিক করেন। কিন্তু চাহিদামতো ঘুষ না পেলে পণ্যের এইচএস কোড পরিবর্তনসহ নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে অহেতুক সময়ক্ষেপণ করা হয়।

ঢাকা কাস্টমস এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি এসএমএ খায়ের মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, ‘ঢাকা কাস্টমসে আমদানি পণ্যের পাহাড় জমেছে। এর মধ্যে করোনার ওষুধ ও সেবাসামগ্রীও আটকে আছে। অফিসার সংকটের কথা বলে এগুলো খালাস করা হচ্ছে না।’

ঢাকা কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, চলমান সরকারি ছুটিতে রোস্টার অনুযায়ী ডিউটি পালন করছেন কর্মকর্তারা। একজন সহকারী ও উপকমিশনারের অধীনে কয়েকজন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ও রাজস্ব কর্মকর্তার সমন্বয়ে টিম গঠন করে দেয়া হয়েছে। শিফট অনুযায়ী এই টিমের সদস্যদের দায়িত্ব পালনের কথা। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। যেমনটি চলছে কমলাপুর আইসিডিতে।

এদিকে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা বলেন, ঢাকা কাস্টমস দিয়ে পণ্য আমদানিতে কয়েকশ’ গুণ বেশি ভাড়া গুনতে হয়। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া শিল্প উদ্যোক্তাদের কেউ এই কাস্টমস ব্যবহার করেন না। মূলত জরুরি পণ্য, শিল্পের স্যাম্পল এবং অতি প্রয়োজনীয় কাঁচামাল কয়েকশ’ গুণ বেশি ভাড়া দিয়েই চার্টার্ড বিমানে আনা হয়। কিন্তু পণ্য দেশে নামার পরই শুরু হয় নানারকম হয়রানি। প্রথমে শুরু হয় বিমানের হয়রানি। এরপর প্রতিটি কাগজ খালাসে বিমানের ১০-১২টি ডেস্কে নির্ধারিত হারে ঘুষ দিতে হয়।

দ্বিতীয় ধাপে শুরু হয় কাস্টমসের যন্ত্রণা। নানা অজুহাতে প্রথমে কাগজ আটকে রাখা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হল, শুল্কায়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসারের সঙ্গে নেগোসিয়েশনে গেলে সব সমস্যার সমাধান নিমিষেই হয়ে যায়। যারা নেগোসিয়েশনে যেতে চান না, তাদের পণ্যের এইচএস কোড পরিবর্তনসহ নানা ধরনের হয়রানি করা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

পণ্য খালাস করতে আসা সিএন্ডএফ এজেন্টদের অভিযোগ, কমিশনারের রোস্টার অনুযায়ী রাজস্ব কর্মকর্তা ও সহকারী কর্মকর্তারা অফিস করেন না। অফিস করলেও অল্প সময়ের জন্য আসেন। এই সময়ে শুধু নেগোসিয়েশনে আসা সিএন্ডএফের কাগজপত্রগুলোই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মালামাল খালাসের অর্ডার দেয়া হয়। এর বাইরে নিজেদের স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা বলে অন্য সিএন্ডএফের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন এবং রোস্টার সময় শেষ হওয়ার আগেই তারা বাসায় চলে যান। মূলত রাজস্ব কর্মকর্তা ও সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তারা অ্যাসেসমেন্টের দায়িত্ব পালন করেন।

তাদের রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে সহকারী এবং উপকমিশনাররা পণ্য খালাসের আদেশ দেন। যেহেতু তারাই কর্মস্থলে কম সময় উপস্থিত থাকেন, তাই সিএন্ডএফ এজেন্ট এবং ব্যবসায়ীরা চাইলেও সঠিক সময়ে মালামাল খালাস নিতে পারেন না। এক্ষেত্রে সহকারী এবং উপকমিশনারদেরও করার কিছু থাকে না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা কাস্টমসের কমিশনার মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, করোনাসামগ্রী দ্রুত খালাসকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দেয়া আছে। তারপরও লোকবল স্বল্পতার কারণে সবাইকে কাক্সিক্ষত সেবা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, কাস্টমস অফিসাররাও মানুষ। তাদের নিরাপত্তার বিষয়গুলোও সবাইকে দেখতে হবে।

সুত্র: দৈনিক যুগান্তর

মতামত