করোনা ভাইরাসে সাতকানিয়ায় হল চট্টগ্রামের প্রথম মৃত্যু, লকডাউন হল ৩৪২টি পরিবার

আবদুল আউয়াল জনি, সিটিজি ভয়েস টিভি:

কভিট-১৯ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে চট্টগ্রামের প্রথম মৃত্যু হয়েছে সাতকানিয়া উপজেলায়। গত ৯ এপ্রিল বৃহস্পতিবার রাতে উপজেলার পশ্চিম ঢেমশা ইউনিয়নের ইছামতি আলীনগর এলাকায় সিরাজুল ইসলাম (৬৫) নামের ওই ব্যক্তি মারা যান। তিনি সোনাজানের বর বাড়ির মৃত এজাহার মিয়ার পুত্র। ফৌজদারহাটে অবস্থিত বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অভ ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেজ (বিআইটিআইডি) হতে নমুনা পরীক্ষার রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডাক্তার হাসান শাহরিয়ার কবির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

সাতকানিয়ার পশ্চিম ঢেমশা ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের ইছামতি আলীনগর এলাকার নাজিম উদ্দিন জানান, গত ৪ এপ্রিল (শনিবার) থেকে সিরাজুল ইসলাম জ্বর, সর্দি কাশি ও শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন। গত বুধবার রাতে চিকিৎসার জন্য প্রথমে তাকে কেরানীহাট আশশেফা হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে জরুরি বিভাগ দেখানোর পর করোনার উপসর্গ থাকায় কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেন। ওইদিন রাতে তাকে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর প্রাথমিক চিকিৎসা দেন এবং পরের দিন সকালে তার নমুনা সংগ্রহ করার কথা জানান। পরে রোগীর সাথে থাকা লোকজন কাউকে কিছু না জানিয়ে তাকে বাড়িতে নিয়ে আসেন এবং পরের দিন নমুনা দেয়ার জন্য চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে যাননি। কেরানীহাটের একটি বেসরকারি হাসপাতাল এনে রোগীকে অক্সিজেন দেওয়া হয়।

সন্ধ্যার দিকে রোগীর অবস্থার অবনতি হলে পরিবারের লোকজন স্থানীয় পল্লী চিকিৎসক নুর মোহাম্মদকে ডেকে আনেন। পল্লী চিকিৎসক নুর মোহাম্মদ দেখার পর তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এরপরও পরিবারের লোকজন তাকে পুনরায় কেরানীহাট আশশেফা হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে রোগীর বিষয়ে বিস্তারিত শোনার পর তাকে দ্রুত চমেক হাসপাতালে নেয়ার পরামর্শ দেন। সেখান থেকে রাতে অ্যাম্বুলেন্সযোগে চমেক হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এরপর চমেক হাসপাতালে নমুনা সংগ্রহের পর তার লাশ শুক্রবার ভোরে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে শুক্রবার সকালে জানাজা শেষে তার লাশ দাফন করা হয়।

কেরানীহাট আশশেফা হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডাক্তার হোসাইন জাহেদ বলেন, ‘বুধবার রাতে সিরাজুল ইসলাম নামের বয়স্ক এক রোগীকে হাসপাতালে আনা হয়। আমি যথাযথ সুরক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে থেকে জরুরি বিভাগে ওই রোগীকে দেখি। জ্বর, সর্দি-কাশি ও শ্বাসকষ্টসহ করোনার উপসর্গ থাকায় রোগীর স্বজনদেরকে আমি তাকে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিই। শুনেছি তাকে জেনারেল হাসপাতালে নেয়া হয়েছিল।

এদিকে, বৃহস্পতিবারে মারা যাওয়া সিরাজুল ইসলামের শরীরে করোনা সংক্রমণ পাওয়ার বিষয়টি এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার পর সবার মধ্যে আতংক বিরাজ করছে।

অন্যদিকে, করোনায় আক্রান্ত হয়ে সিরাজুল ইসলামের মৃত্যু হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর শনিবার রাত আনুমানিক সাড়ে ১১টায় পশ্চিম ঢেমশা ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডটি পুরোপুরিভাবে লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে।

সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ নূর এ আলম, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ ওসমানী ও সাতকানিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সফিউল কবীর এলাকায় উপস্থিত হয়ে লোকজনের সাথে কথা বলার পর ইছামতি আলীনগরের পুরো ওয়ার্ডটি লকডাউন ঘোষণার বিষয়টি মাইকে প্রচার করেন এবং লাল পতাকা টাঙিয়ে দেন। লকডাউনকৃত ওয়ার্ডটিতে সর্বমোট ৩৪২টি পরিবার বসবাস করে বলে জানা গেছে।

সাতকানিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার মোহাম্মদ আবদুল মজিদ ওসমানী বলেন, করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সিরাজুল ইসলামের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর আমরা এলাকায় গিয়ে লোকজনের সাথে কথা বলার পর পশ্চিম ঢেমশার ৩নং ওয়ার্ডটি লকডাউন করা হয়েছে। তিনি আরো জানান, কেরানীহাটে যে হাসপাতালে তাকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে সেই হাসপাতালের চিকিৎসক, স্টাফ ও অ্যাম্বুলেন্সের চালকসহ রোগীর সংস্পর্শে আসা সবাইকে কোয়ারেন্টিনে রাখার ব্যবস্থা করা হবে।

সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ নূর এ আলম বলেন, ‘করোনায় আক্রান্ত হয়ে পুরো চট্টগ্রামের মধ্যে প্রথম মৃত্যু সাতকানিয়ায়। সিরাজুল ইসলাম নামের ওই ব্যক্তির মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর আমরা এলাকায় গিয়ে পুরো একটি ওয়ার্ড লকডাউন করেছি। লকডাউনের বিষয়টি মাইকে প্রচার করে দিয়েছি। এ ওয়ার্ডে মোট ৩৪২টি পরিবারের বসবাস রয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত পুরো ওয়ার্ডের লোকজনকে বাইরে না যাওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সাথে বাইরের লোকজনও যাতে ওই ওয়ার্ডে না ঢুকে সেই বিষয়ে বলা হয়েছে। ইউএনও আরো জানান, করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া সিরাজুল ইসলামের পরিবার এবং আশপাশের লোকজনের সাথে সংস্পর্শে আসা সবাইকে চিহ্নিত করে তাদের পরিবারগুলো লকডাউন করা হবে।

মতামত