একজন ডাক্তার বিদ্যুৎ বড়ুয়া, একটি স্বপ্ন ও চট্টগ্রাম ফিল্ড হাসপাতাল

সিটিজি ভয়েস টিভি ডেস্ক:

এক সময় উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংকটময় মুহূর্তে বিশেষ অবস্থায় রোগীদের চিকিৎসায় রাতারাতি ফিল্ড হাসপাতাল তৈরি হতে দেখে আমরা অবাক হয়েছি, হয়ত স্বপ্নও দেখেছি আমাদের দেশের সংকটময় মুহূর্তে এই ধরনের ফিল্ড হাসপাতাল হবে। কিন্তু অতীতে এই স্বপ্ন কেউ কেউ দেখে থাকলেও বাস্তবায়ন করতে কেউ সাহস করে এগিয়ে আসেনি। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের কারণে যখন সমগ্র পৃথিবীর মানুষ অজানা ভয় ও শঙ্কায় শঙ্কিত তখন আমাদের দেশে ফিল্ড হাসপাতাল তৈরি করার স্বপ্ন দেখে সেটিকে বাস্তবে রুপান্তর করে দেখিয়েছেন একজন মানবিক মানুষ। তার নাম ডাক্তার বিদ্যুত বড়ুয়া।

উন্নত বিশ্বে অর্থের সংকট নিয়ে তাদেরকে ভাবতে হয় না। আমাদের ভাবনার প্রয়োজন পড়ে। ডাক্তার বিদ্যুত বড়ুয়া কোন ধনকুবের নন। বড় ব্যবসায়ীও নন। তাহলে কোথায় পাবেন এত অর্থ? কিভাবে নির্মাণ হবে ফিল্ড হাসপাতাল ! কিন্ত মানুষকে তো বাঁচাতে হবে !

মাদার তেরেসা বলেছেন, “আমরা সকলেই শুরুতেই বিশাল কোনো মহৎ কাজ করতে পারবো না। কিন্তু ভালবাসা দিয়ে ছোট ছোট অনেক ভাল কাজ, বড় কাজে রুপান্তর করা সম্ভব।“ এই কথাটিকেই মূলমন্ত্র হিসেবে নিয়ে মাঠে নামলেন তিনি। তিনি বললেন, ফিল্ড হাসপাতাল তৈরি হবে প্রতিটি মানুষের অর্থায়নে ! প্রতিটি মানুষ একশ টাকা করে দিলে হাসপাতাল হয়ে যাবে। তহবিল তৈরির কাজ শুরু হলো, মানুষ ভালবেসে সাড়া দিতে শুরু করলেন এই মহান কর্মের অংশিদার হতে। একই সাথে চলতে থাকলো কাজ। চীনের উহানে মাত্র ১০ দিনে তৈরি হয়েছিল করোনা চিকিৎসার হাসপাতাল। ওই সময়ে না হলেও বাংলাদেশে এই প্রথম মাত্র ২০ দিনেই তৈরি হয়েছে করোনা চিকিৎসায় চট্টগ্রাম ফ্লিড হাসপাতাল (সিএফএইচ)।

চট্টগ্রামের ফৌজদারহাটের সলিমপুরে নাভানা গ্রুপের আফতাব আটোমোবাইল সহায়তা করলো স্থান দিয়ে। সামর্থবানরা কেউ কেউ আরো বেশি অর্থ সাহায্য নিয়ে উপস্থিত হলেন। তারপর প্রতিষ্ঠানটির আফতাব অটোমোবাইলস লিমিটেড কারখানার ভেতরে ৬ হাজার ৮০০ বর্গফুটের দ্বিতল ভবনে ৫০-৬০ শয্যার অস্থায়ী হাসপাতালটি চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক পরিদর্শন করে হাসপাতাল নির্মাণে অনুমতি দানসহ প্রশংসা করেন।

করোনাভাইরাসের মহামারীতে আতঙ্কিত সারাবিশ্ব, পাওয়া যাচ্ছে না কোনো প্রতিষেধক। চট্টগ্রাম নগরীর বড় বড় বেসরকারি হাসপাতালগুলো যখন সরীসৃপ প্রাণী কচ্ছপের মত হাত পা গুটিয়ে নেয়। ঠিক এই সময়েই করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমে অল্প হলেও আশার আলো দেখিয়ে ডাক্তার বিদ্যুৎ বড়ুয়া করোনা রোগীদের চিকিৎসা সেবায় একটি আশ্রয় কেন্দ্র তৈরিতে সফল হন।

ডাক্তার বিদ্যুৎ বড়ুয়া ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে বসবাস করতেন। করোনা সংকটে তিনি ছুটে এসেছেন দেশে। মাতৃভূমি এবং তার মানুষের সেবায় তিনি জীবনকে পরোপকারে নিয়োজিত করা জরুরি মনে করলেন। আসলে ‘যে মন কর্তব্যরত নয় সে মন অনুপভোগ্য’। বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে দেখি এই হাসপাতালের কর্মকান্ড। দেখি কিভাবে ছোট ছোট বালুকণা, বিন্দু বিন্দু জল, মিলে একটি বড় মহাদেশ, সাগর অতল গড়ে তোলা হল। ভাল লাগে। আমাদের সমাজের জন্য তো এমন মানুষই দরকার। তিনি তো কুসুমকুমারী দাশে’র কবিতার সেই ‘আদর্শ ছেলে’। যে কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হতে চায় ! মুখে হাসি, বুকে বল তেজে ভরা মন নিয়ে “মানুষ” হবার পণ করে,মানুষের জন্য কাজ করার মন নিয়ে এগিয়ে যায়।

বাংলাদেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ বড়ুয়ার মতো মানুষ খুব প্রয়োজন। বিশেষ করে তার মতো এমন মেধা, মননশীল ও কাজ নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার মতো উদ্যমী লোক বাংলাদেশের রাজনীতি প্রচন্ড রকম প্রয়োজন। রাজনীতিতে আমাদের সঠিক মানুষ নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ সময় এটি। জাতীয় দুর্যোগে তার মতো মানুষই দিশা হয়ে দাঁড়াবেন।

একটি মানুষ যখন সবাইকে ভালবাসতে শিখবে, সবার কল্যাণে কাজ করে যাবে- জীবনের প্রান্তিলগ্নে গিয়ে দেখবে মানুষের ভালবাসায় তিনি একদম আকণ্ঠ ডুবে থাকেন।

বিশ্বাস করুন এরচেয়ে পরিতৃপ্তি জীবনে আর কিছুতে হতে পারে না ! একজন বিদ্যুৎ বড়ুয়া যে কাজ শুরু করেছেন তা করবার জন্য শক্তি যেন সব সময় অক্ষত থাকে।

ডা. বিদ্যুৎ বড়ুয়া, বর্তমানে পাবলিক হেলথ ফ্যাকাল্টি হিসাবে আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশে কাজ করছেন। ব্যক্তিগত জীবনে দুই সন্তানের জনক। বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট সুনীল কান্তি বড়ুয়া। মা- গৃহিনী। একমাত্র ভাই ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া- বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ও আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক।

তথ্যসূত্র: বাংলাধারা, ইষৎ পরিবর্তিত, পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত।

মতামত