চলমান থাকবে সিগারেটসহ তামাক উৎপাদন ও পণ্য বিপণন: শিল্প মন্ত্রণালয়

সিটিজি ভয়েস টিভি ডেস্ক:

সিগারেটসহ তামাক উৎপাদন ও তামাক জাতীয় পণ্য বিপণন চলমান থাকবে বলে জানিয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়। তামাক উৎপাদন ও তামাক পণ্য সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে মর্মে শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুনকে উদ্ধৃত করে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের পরিপ্রেক্ষিতে শিল্প মন্ত্রণালয় আজ এ তথ্য জানায়।

সংবাদমাধ্যমে পাঠানো বক্তব্যে শিল্প মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তামাক বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প। এ শিল্পের সঙ্গে দেশের হাজার হাজার প্রান্তিক চাষি এবং শ্রমিকের কর্মসংস্থান জড়িত। জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হলেও শিল্পোন্নত দেশগুলোসহ গোটা বিশ্বে এখন পর্যন্ত তামাক শিল্প চালু রয়েছে। বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগে এ শিল্পের অবদান সবচেয়ে বেশি। এর পাশাপাশি জাতীয় আয়ের উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আহরণ হয় এ খাত থেকে।

অধিকন্তু কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক অর্থনীতির মতো বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতিতেও যথেষ্ট চাপ রয়েছে এবং আগামী দিনে অনিবার্যভাবে চাপ আরো বাড়বে। করোনা প্রাদুর্ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সরকার নগদ অর্থ ও ত্রাণ বিতরণে চালু করেছে নানা কর্মসূচি। এমতাবস্থায় বিদ্যমান কর্মসংস্থানের সুযোগ ও শিল্প উৎপাদন বন্ধ করলে,তা হবে জাতীয় মারাত্মক ক্ষতি। তাই সামগ্রিক বিবেচনায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে এ শিল্প চালু রাখা যুক্তিসঙ্গত।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যের বিষয়ে শিল্প সচিব মো. আবদুল হালিম বলেন, ‘আমরা বৈদেশিক বিনিয়োগ যখন দেশে নিয়ে আসি, তখন কিছু শর্ত বা বিনিয়োগ সুবিধা যেটাই বলেন, সেটা দেওয়া হয়। যেমন তামাক পণ্যকে জরুরি পণ্য হিসেবে বলা আছে। এই সময় তাদের আরো বেশি সুবিধা দেওেয়ার কথা। কিন্তু আমরা আগেই যে শর্ত বা সুবিধা দিয়েছি, সেটাতো বন্ধ করে দিতে পারি না।’ তবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ব্যাপারে তাদের নির্দেশনা দেওয়া যেতে পারে বলে তিনি মত দেন। তিনি বলেন, করোনা দুর্যোগের সময় মানুষ যখন কর্মহীন হচ্ছে, দরিদ্র জনগোষ্ঠী দুঃসময় পার করছে। সরকার তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে। এমতাবস্থায় আমরা মানুষের কর্মসংস্থান বন্ধ করতে পারি না।

শিল্প সচিব জানান, দেশের কর্মসংস্থান ও কৃষকের স্বার্থ সুরক্ষা এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রবাহ ও রাজস্ব আয় চলমান রাখতে তামাক উৎপাদন ও তামাক পণ্য বিপণন বন্ধ করা হবে না। বরং এই মুহূর্তে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ত্রাণ কর্মসূচি পরিচালনায় অধিক অর্থ দরকার। তাই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব আয়ের খাত বন্ধ করা কোনোভাবেই সমুচিত নয়।

সংবাদমাধ্যমে পাঠানো বক্তব্যে শিল্প মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে, এই শিল্প হুট করে বন্ধ করে দেওয়া হলে, একদিকে যেমন দেশ বিরাট অঙ্কের রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হবে, অন্যদিকে বিপুল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগও বন্ধ হবে। আবার তামাক পাতা না কিনলে প্রান্তিক চাষিরা মারাত্বকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ ছাড়া এ ধরনের সিদ্ধান্তে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একটি নেতিবাচক ধারণা তৈরি হবে। যা আমাদের বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

করোনা প্রাদুর্ভাবের কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকায় শিল্প-কারখানা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে। এতে করে প্রান্তিক লোকজন বেকার হয়ে গেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনির আওতায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে নগদ অর্থ ও ত্রাণ বিতরণ কর্মসূচি গ্রহণ করলেও উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে সরকারের জন্য দীর্ঘদিন এটি চালিয়ে নেওয়া কষ্টকর হবে। এই অবস্থায় বিদ্যমান কর্মসংস্থানের সুযোগ ও শিল্প উৎপাদন বন্ধ হলে অর্থনীতির জন্য হবে মারাত্মক ক্ষতি।

শিল্প মন্ত্রণালয় জানায়, বাংলাদেশে কোভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাবে প্রাথমিক পর্যায়ে সরকারঘোষিত সাধারণ ছুটি ও লকডাউনের সূচনালগ্নে দুইটি তামাক কোম্পানির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শিল্প মন্ত্রণালয় গত ৩ ও ৫ এপ্রিল আবেদনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদানের জন্য সংশ্লিষ্টদের কাছে অনুরোধ করে। পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মূখ্য সচিব ৯ এপ্রিল জরুরি সেবা ও সরবরাহ কাঠামো স্বাভাবিক রাখার স্বার্থে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাসহ পরিপত্র জারি করে। এ ছাড়া মন্ত্রিপরিষদ সচিব গত ২৪ মার্চ জরুরি সেবা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ বিষয়ে একটি প্রেসনোট জারি করেন।

১৯৫৬ সালের দ্য কন্ট্রোল অব অ্যাসেনসিয়াল কমোডিটিজ, অ্যাক্ট অনুযায়ী সিগারেট একটি অত্যবশকীয় পণ্য। এ বিবেচনায় শিল্প মন্ত্রণালয় কোভিড-১৯ সংক্রমণ চলাকালীন তামাক কোম্পানির উৎপাদন সরবরাহ ও পরিবহনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সহায়তার অনুরোধ জানিয়ে পত্র দেয়। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের অধীন জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের উদ্দেশ্যের সঙ্গে শিল্প মন্ত্রণালয়ের কোনো ভিন্নতা নেই। শিল্প মন্ত্রণালয় ২০৪১ সালের মধ্যে ধূমপানমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার নীতিকে পূর্ণাঙ্গভাবে সমর্থন করে এবং এ লক্ষ্যে কাজ করছে।

মন্ত্রণালয় মনে করে, ধূমপান কিংবা তামাক জাতীয় পণ্যের ব্যবহার স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হলেও এর ব্যবহারকারীরা তা জেনে-শোনেই সেবন করছে। এ শিল্প সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিলেও, তারা এটি সেবন করবে। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত মোটিভেশন ছাড়া শুধু সাময়িক উৎপাদন বন্ধ করে করোনাকালে ধূমপান প্রতিরোধ করা যাবে না। উপরন্তু, এর উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলে কালোবাজারিরা উৎসাহিত হবে এবং আমদানিকৃত সিগারেটসহ তামাকজাত পণ্যের মাধ্যমে দেশ মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা ও রাজস্ব হারাবে। এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের অধীন জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল ধূমপায়ী ও তামাক পণ্য সেবীদের মধ্যে এটি পরিহারের বিষয়ে প্রচার জোরদার করতে পারে।

শিল্প মন্ত্রণালয় বলছে, সামগ্রিক বিবেচনায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে এ শিল্প চালু রাখা যেমন যৌক্তিক তেমনি তামাক পণ্য সেবনের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ধূর্মপানমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য অর্জনও সম্ভব হবে। এ ক্ষেত্রে জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল সময়ের চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় মোটিভেশনাল কার্যক্রম গ্রহণ করবে বলে শিল্প মন্ত্রণালয় আশাবাদ ব্যক্ত করেছে।

সুত্রঃ বাসস

মতামত