সুন্দরী নারী সেজে ফেসবুকে প্রেমের ফাঁদ পেতে জিয়ানের প্রতারণা: হাতিয়ে নিয়েছে লাখ লাখ টাকা

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে বিভিন্ন সুন্দরী মেয়ের ছবি দিয়ে অনেকগুলো ফেইক আইডির মাধ্যমে জোবাইরুল হক জিয়ান নামের এক প্রতারকের খপ্পরে পড়ে লক্ষ লক্ষ টাকা হারিয়ে অনেকে নিঃস্ব হয়ে গেলেও লোকলজ্জার ভয়ে তা প্রকাশ করেননি। এছাড়াও ওই প্রতারকের প্রতারণার জালে জড়িয়ে সংসার ভেঙ্গে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল অনেকের তবে সম্প্রতি জিপিএইচ মালিকের মেয়ে সেজে ফেসবুক প্রেমের ফাঁদ পেতে প্রতারণা করতে গিয়ে সাতকানিয়া থানা পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে ওই প্রতারক। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সাতকানিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হাসানুজ্জামান মোল্লা।

চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার ছদাহা ছৈয়দাবাদ এলাকার আব্দুল আজিজের ছেলে জোবাইরুল হক জিয়ান (২২) নামের ওই প্রতারক।

শুক্রবার (২৯ মে) রাতে সাতকানিয়া সার্কেলের এএসপি হাসানুজ্জামান মোল্লার নেতৃত্বে সাতকানিয়া থানা পুলিশ এই ফেসবুক প্রতারককে গ্রেফতার করে। এ সময় প্রতারক জিয়ানের কাছ থেকে তিনটি মোবাইল ফোন ও পাঁচটি সিম কার্ড উদ্ধার করা হয়েছে। শনিবার (৩০ মে) তাকে সিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

কে নেই এই প্রতারক জিয়ানের কাছে প্রতারিত হওয়ার তালিকায়? আছে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামীলীগ সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন স্তরের নেতা, পুলিশের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা, চট্টগ্রামের বিভিন্ন ধনাঢ্য ব্যবসায়ীসহ বাদ যায়নি কেউই।

জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জিপিএইচ ইস্পাতের ব্যাবস্থাপনা পরিচালক জাহাঙ্গীর আলমের মেয়ের ছবি ব্যবহার করে বিভিন্ন মানুষের সাথে সাথে জিপিএইচ ইস্পাতের মালিকের মেয়ে সেজে প্রেমালাপ করে আসছিল। প্রেমালাপের ভেতরেই নানা অজুহাতে তিনি টাকা চাইতেন। টাকা না দিলে ওই চ্যাটের স্ক্রিনশট ফাঁস করার ভয় দেখাতেন। এতে এদের অনেকেই তাকে টাকা দিতে বাধ্য হতেন। এভাবে কয়েক লাখ টাকা জোবাইরুল হক জিয়ান আদায় করেছে বলে তথ্য পেয়েছে পুলিশ।

এসব প্রতারণার কথা ছড়িয়ে পড়লে চট্টগ্রামে পিটুপি নামের এক প্রতিষ্ঠানের মালিক আশরাফুল আলম আলভী চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানায় গত ২৭ এপ্রিল একটি মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় তিনি অভিযোগ করেন, দুটি মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে তার স্ত্রীর নাম দিয়ে আপত্তিকর ছবি আদান-প্রদান ও অশালীন কথোপকথন আদান-প্রদানের মাধ্যমে তার পরিচিত বিভিন্ন ব্যক্তি ও আত্মীয়স্বজনের কাছে থেকে টাকা দাবি করা হচ্ছিল।

এই অভিযোগের সূত্র ধরে পুলিশ মাঠে নামে নেপথ্যে থাকা মূল অপরাধীর খোঁজে। কিন্তু ধূর্ত এই প্রতারকের হদিসও পাচ্ছিল না পুলিশ। এর মধ্যেই একটি ভুলে ধরা পড়ে যায় জিহান নামের ওই প্রতারক। এতে প্রতারক জিহান সম্পর্কে প্রথম ধারণা পায় পুলিশ।

তদন্তে নেমে দেখা যায়, ‘জিপিএইচ মালিকের মেয়ের প্রেমে’ মগ্ন হয়ে কোনো মানুষ কথা বলতে চাইলে অভিযুক্ত জিয়ান তার এক তরুণী আত্মীয়কে ব্যবহার করতো অথবা ভয়েস পরিবর্তন করার এ্যাপস ব্যাবহার করে নিজেই কথা বলত।

থানা সুত্রে জানা যায় ডাক্তার সাবরিনা হোসেন শেফা, ডাক্তার মিশু, ডাক্তার ইসরাত সহ বিভিন্ন নামের ৯টি ফেসবুক আইডির মাধ্যমে প্রতারণার জাল ফেলে প্রতারক জোবাইরুল হক জিয়ান।

সুন্দরী এসব নারীর সঙ্গে চট্টগ্রামের একাধিক নেতা, প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা ও ব্যাবসায়ীদের সাথে রীতিমতো প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। রাতভর মেসেঞ্জার ভরে ওঠে বিভিন্ন রসাত্মক আলাপে। ইনবক্সের সেই চ্যাটই একসময় হয়ে ওঠে তার মূল পুঁজি। প্রথমে দাবি করেন টাকা, টাকা না দিলেই চ্যাটের স্ক্রিনশট ফাঁস করে দেওয়ার ভয় দেখানোর মাধ্যমে আদায় করা হয় লাখ লাখ টাকা।

জোবাইরুল হক জিয়ান নামের সেই প্রতারক বছরদুয়েক ছিল সৌদি আরবে। পরে দেশে এসে সাতকানিয়া উপজেলা ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িত হন। জিয়ান সাতকানিয়া উপজেলা ছাত্রলীগের বিলুপ্ত কমিটির শিক্ষা ও পাঠচক্র বিষয়ক সম্পাদক ছিল। সে সুবাদে নেতাদের ‘চাহিদা’ সম্পর্কে জেনে ভুয়া ফেসবুক আইডি থেকে টোপ ফেলতে থাকে। চট্টগ্রামের নামি শিল্পপ্রতিষ্ঠান জিপিএইচ ইস্পাতের মালিকের মেয়ের ছবি ও অন্যান্য তথ্য ব্যবহার করে ফেসবুকে খোলেন ভুয়া আইডি। সেই আইডি থেকে ফেলা টোপে সহজেই ধরা দেন মানুষরা। জিয়ান হয়ে যান ফেসবুকের ওই প্রান্তে থাকা মানুষদের স্বপ্নের রমণী!

নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক চট্টগ্রামের বিলাসবহুল একটি অভিজাত শপিং মলের ধনাঢ্য এক ব্যবসায়ী সিটিজি ভয়েস টিভিকে জানান, প্রায় সাড়ে তিন বছর আগে ফেসবুকে একটি নারীর আইডি থেকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট আসে আমি একসেপ্ট করার পর ওই আইডি থেকে আমাকে ভাই সম্বোধন করে আমার সাথে সম্পর্ক তৈরি করে, বিভিন্ন সময় পড়াশোনা করতে পারছেনা, বই লাগবে টিউশন ফি লাগবে, বাবা অসুস্থ মা অসুস্থ সহ বিভিন্ন অযুহাতে লক্ষ লক্ষ টাকা নেয়, আমিও গরিব একটি পরিবারকে সাহায্য করে আসছিলাম, আমার কাছ থেকে আরও বেশি টাকা আদায় করার লক্ষ্য নিয়ে উক্ত আইডি থেকে আমার কাছে তার খালাত ভাইকে পাটাচ্ছে বলে মেসেজ পাটিয়ে দৃশ্যপটে হাজির হয় প্রতারক জিয়ান, এরপর থেকেই বিভিন্ন ভাবে সে তার খালাত বোনকে বিয়ে করতে উৎসাহ দিতে থাকে, আমিও মেয়েটির প্রতি মানষিক ভাবে কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ি, আমি বুঝতে পারিনি প্রতারক জিয়ান ফেসবুক আইডির মেয়েটি সেজে আমার সাথে প্রতারণা চালিয়ে আসছিল। একপর্যায়ে সে মেয়েটির সাথে আমার বিভিন্ন অন্তরঙ্গ আলাপের স্কিনসট দেখিয়ে আমাকে বলে আমার খালাত বোনকে বিয়ে করতে হবে নাহলে আমাকে ২০ লক্ষ টাকা দিতে হবে, নয়ত আমি এসব তোমার পরিবারের সদস্যদের কাছে পৌঁছে দেব এবং আইনি ভাবে হয়রানি করব। এভাবে হুমকি দেওয়ার ২দিন পর জিয়ান আমাকে জানায় তার খালাত বোন আমার জন্য আত্মহত্যা করেছে আমাকে সেটার দায় বহন করতে হবে। আমি ঘাবড়ে গেলে সে আমার কাছথেকে টাকা আদায় করার লক্ষ্য নিয়ে আওয়ামী লীগের একজন কেন্দ্রীয় নেতার আত্মীয় পরিচয় দিয়ে কয়েকজন সাংবাদিককে স্কিনসট সহ বিভিন্ন মিথ্যা তথ্য দিয়ে আমার বিরুদ্ধে নিউজ করায় এতে আমি সামাজিক ও পারিবারিক ভাবে চরম লজ্জায় পতিত হই। এরপর আমি জিয়ান ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করলে সে সৌদি আরবে পালিয়ে গিয়েছিল। আমি পরে বুঝতে পারি সাংবাদিকরাও তার প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে না পেরে নিউজ করেছিলেন।

জোবাইরুল হক জিয়ান নামের ওই প্রতারককে আইনের আওতায় আনায় প্রশাসনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা এবং তার এবং তার সহযোগীদের দৃষ্টান্তমুলক শাস্তির দাবী জানান।

প্রতারক জিয়ানকে গ্রেফতারের বিষয়ে সাতকানিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হাসানুজ্জামান মোল্লা সিটিজি ভয়েস টিভিকে বলেন, ডাক্তার সাবরিনা হোসেন শেফা, ডাক্তার মিশু, ডাক্তার ইসরাত সহ বিভিন্ন নামের ৯টি ফেসবুক আইডির মাধ্যমে প্রতারণার জাল ফেলে প্রতারক জোবাইরুল হক জিয়ান। এরপর বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা, প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা ও ব্যাবসায়ীদের সাথে রীতিমতো প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলে ভয়েস এ্যাপ ব্যাবহারের মাধ্যমে নারী কন্ঠে কথা বলে এবং মেসেঞ্জারে বিভিন্ন রসাত্মক আলাপ গড়ে তুলে। ইনবক্সের সেই চ্যাটই একসময় হয়ে ওঠে তার মূল পুঁজি। প্রথমে দাবি করেন টাকা, টাকা না দিলেই চ্যাটের স্ক্রিনশট ফাঁস করে দেওয়ার ভয় দেখানোর মাধ্যমে আদায় করা হয় লাখ লাখ টাকা।

তিনি আরো বলেন, যাদের ছবি ব্যাবহার করত তাদের পরিবারের একজন পিটুপি নামের এক প্রতিষ্ঠানের মালিক আশরাফুল আলম আলভী চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানায় গত ২৭ এপ্রিল একটি মামলা দায়ের করেন সেটার ভিত্তিতে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। পাশাপাশি সাতকানিয়া থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৪/২৫/৩৫ ধারায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এরপর তাকে সিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আমরা তদন্ত চালাচ্ছি এবং এতে আরও কে কে জড়িত তাও শনাক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছি।

মতামত