আইনজীবী মুরাদের আইনি সহায়তায় মুক্ত হাসিনা বেগম, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করলেন ছেলে

সিটিজি ভয়েস টিভি ডেস্ক:

 

আসামি না হয়েও কারাভোগ করা হাসিনা বেগম অবশেষে মুক্তি পেয়েছেন। মঙ্গলবার বিকেলে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্ত হন তিনি। আর মুক্তি পেয়েই তিনি ফেরত চেয়েছেন জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া সেই ১৬ মাস।

কারা ফটকে দাঁড়িয়ে আনন্দাশ্রু মুছতে মুছতে হাসিনা বেগম বলেন, ‘এত দিন কেঁদেছি দুঃখে। আজ খুশিতে। যারা আমার জীবন থেকে ১৬টি মাস শেষ করে দিয়েছে, তাদের শাস্তি চাই। তছনছ হয়ে গেছে আমার সংসার। আমি ফেরত চাই হারানো সময়। আমার হারানো ১৬ মাস ফিরিয়ে দেবে কে?’

প্রসঙ্গত, মাদকের মামলায় ৬ বছর সাজাপ্রাপ্ত হয়েছেন হাসিনা আক্তার নামের এক নারী। কিন্তু নামের একাংশের মিল থাকায় পুলিশ গ্রেপ্তার করে হাসিনা বেগমকে। পুলিশের ভুলে ১ বছর ৪ মাস ২০ দিন ধরে সাজা খাটছিলেন হাসিনা বেগম। মঙ্গলবার দুপুরে তাকে মুক্তির নির্দেশ দেন চট্টগ্রামের চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ শরীফুল আলম ভূঁঞা। এ নির্দেশনার পর বিকেলে মুক্ত হন নিরাপরাধ হাসিনা বেগম।

হাসিনা বেগমকে আইনি সহায়তা দিয়েছেন আইনজীবী গোলাম মুরাদ। তিনি বলেন, ‘পুলিশের ভুলে হাসিনা বেগমের জীবন থেকে ১৬টি মাস হারিয়ে গেল। আমরা ক্ষতিপূরণের জন্য আদালতে আবেদন করব। ঘটনার পর তার স্বামী তাকে ফেলে চলে যান। এক ছেলে মানুষের বাসায় কাজ করেন। দুই মেয়ে নানির কাছে বড় হচ্ছে। এই দুর্ভোগের দায়ভার কে নেবে? আমরা সবকিছুর ক্ষতিপূরণ চাইব।’

কারাফটকে দীর্ঘদিন পর মায়ের দেখা পেয়ে খুশি হাসিনার বড় ছেলে শামীম নেওয়াজ। মাকে জড়িয়ে ধরে রাখেন তিনি। শামীম নেওয়াজ বলেন, ‘মা কারাগারে যাওয়ার পর মানুষের বাসায় কাজ নিয়েছি। যারা আমাদের এই ক্ষতি করেছে, তাদের বিচার চাই।’

আদালতের বেঞ্চ সহকারী ওমর ফুয়াদ জানান, গত মার্চে হাসিনা বেগমের আইনজীবী আদালতে জানান, মাদকের মামলায় যে হাসিনাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তিনি আসামি হাসিনা নন। এ ঘটনায় দায়ী হাসিনা আক্তার জামিনে গিয়ে পলাতক আছেন। পরে আদালত টেকনাফ থানার পুলিশকে তদন্ত করতে বলেন। তদন্ত শেষে সত্যতা পায় পুলিশ। পরে কারাগারে থাকা আসামির নিবন্ধন বই যাচাই-বাছাই করে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেন আদালত। কারা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রতিবেদন পাওয়ার পর মঙ্গলবার আদালতের নির্দেশে নিরপরাধ হাসিনা বেগমকে মুক্তি দেওয়া হয়।

চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের জ্যেষ্ঠ তত্ত্বাবধায়ক মো. শফিকুল ইসলাম খান মঙ্গলবার আদালতে এক পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন দেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, নগরের কর্ণফুলী থানায় ইয়াবা উদ্ধারের মামলায় ২০১৭ সালে কারাগারে আসা হাসিনা আক্তারের ছবির সঙ্গে ২০১৯ সালে কারাগারে আসা হাসিনা বেগমের ছবির মিল নেই। দু’জনের বয়সের পার্থক্য রয়েছে।

আইনজীবী গোলাম মাওলা মুরাদ বলেন, ‘হাসিনা বেগম ও হাসিনা আক্তার, দু’জনের বাড়ি কক্সবাজারের টেকনাফ পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডে। দু’জনের স্বামীর নামও হামিদ হোসেন। তবে শ্বশুরের নাম ও বাড়ির ঠিকানা আলাদা। হাসিনা বেগমের শ্বশুরের নাম মৃত কবির আহম্মদ। আর হাসিনা আক্তারের শ্বশুরের নাম মৃত জলিল আহমেদ। তাদের বয়সেও অনেক ব্যবধান রয়েছে। তারপরও কেন পুলিশ নিরাপরাধ এক নারীকে অন্যায়ভাবে ফাঁসালো সেটির প্রতিকার চাইব আমরা।’

জানা গেছে, ২০১৭ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি নগরের কর্ণফুলী থানার মইজ্জারটেক এলাকা থেকে পুলিশ হাসিনা আক্তার, তার স্বামী হামিদ ও দুই সন্তানকে দুই হাজার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করে। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে হাসিনা আক্তার ও তার স্বামী হামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। ওই বছরের ২৭ নভেম্বর জামিনে

মুক্তি পান তারা। পরে স্বামী-স্ত্রী আত্মগোপনে যান। আসামিরা পলাতক থাকা অবস্থায় ২০১৯ সালের ১ জুলাই পঞ্চম অতিরিক্ত চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ হাসিনা আক্তার ও তার স্বামী হামিদকে পাঁচ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেন। পরে তাদের সাজা পরোয়ানা আদালত থেকে টেকনাফ থানায় যায়। সেখানে যাওয়ার পর পুলিশ হাসিনা বেগমকে গ্রেপ্তার করে। দীর্ঘ প্রায় দেড় বছর পর এখন জানা গেল যে হাসিনা বেগমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তিনি আসলে এ মামলার আসামি নন।

মতামত